ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার

প্রকাশিত: ১:৫০ পূর্বাহ্ণ, মে ১৯, ২০২০

ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার

ফিচার প্রতিবেদক: ভোঁদড়, নাকের আগার গোঁফ লম্বা ও সংবেদনশীল বিধায় পানির নিচে শিকার সন্ধানের সহায়ক। এই গোত্রে আরও আছে ব্যাজার, নেউল বা বেজি। বাংলাদেশে ভোঁদড়ের তিনটি ও ব্যাজারের একটি প্রজাতি আছে।

 

অস্ট্রেলিয়া ছাড়া ভোঁদড় আছে সব মহাদেশেই। ‘Mustelidae’ গোত্রের সকল সদস্যের মধ্যে ভোঁদড়ই সর্বাধিক জলচর। লিপ্তপদের সাহায্যে এরা ভালই সাঁতার কাটে এবং একবারও না ভেসে পানির নিচে একনাগাড়ে আধ কিলোমিটার যেতে পারে। মাছ, পানির ব্যাঙ, কাঁকড়া ও অন্যান্য বড় আকারের জলজ অমেরুদন্ডীরাই এদের প্রধান খাদ্য, যাদের এরা কখনও কখনও দলবদ্ধভাবে শিকার করে। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের সামুদ্রিক ভোঁদড় হলো হাতিয়ার ব্যবহারক্ষম দুর্লভ স্তন্যপায়ীর অন্যতম, যারা সামনের পা দিয়ে পাথর টেনে তুলে মজবুত পেষণদন্তে সেগুলি টুকরা করে তার উপর শামুক ঝিনুকের শক্ত খোল রেখে ভেঙে থাকে। পাথরগুলি তারা ভাসমান অবস্থায় বুকের উপর রাখে ও কামারের নোহাইর মতো ব্যবহার করে।

 

এরা সমাজবদ্ধ প্রাণী ও ক্রীড়াশীল; একত্রে দৌড়াদৌড়ি করে, কাদার ঢাল বেয়ে নামে, মনে হয় সবই নেহাৎ আনন্দের জন্য। কোন কোন প্রজাতির ভোঁদড় পানিতে পাথর ছুঁড়ে সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে পড়ে সেগুলি তুলে আনে সম্ভবত খেলাচ্ছলেই। এরা বুদ্ধিমান, অনুসন্ধিৎসু ও বন্ধুবৎসল, সহজেই পোষ মানে। সুন্দরবন ও দক্ষিণপশ্চিমের জেলাগুলিতে কেউ কেউ পোষা ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার করে। বাংলাদেশের তিন প্রজাতির ভোঁদড়ের মধ্যে একটি অতি বিপন্ন, অর্থাৎ বিলুপ্তির মুখোমুখি এবং বাকি দুটিও বিপন্ন।

 

ভোঁদরের প্রিয় খাদ্য মাছ। তবে মাছ ছাড়াও বিভিন্ন জলজ প্রাণী শিকারে পটু ভোঁদর। বসবাস জলাশয়ের পাশে বনজঙ্গলে। জলাশয়ের গতিপথ পরিবর্তন, বনজঙ্গল ধ্বংস করে নদীর পারে বসতি নির্মাণ, কারেন্ট জালে মাছ শিকারের সময় ধরা পড়া ভোঁদড় মেরে ফেলার ফলে ভোঁদরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমে আসছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রাণীটিকে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করা হলেও স্থানীয় মানুষের নানা কুসংস্কার আর অসচেতনতার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এই প্রাণীটি। পুকুরের মাছ খেয়ে ফেলবে এই ভয়ে অনেকেই লোকালয়ের আশেপাশের ভোঁদর মেরে ফেলতে উদ্যত হোন। অনেক চক্র আবার ভোঁদরের চামড়ার ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ের জেলেরা শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখে পালন করে যাচ্ছেন ভোঁদর।

 

মোটামুটি দু’শ বছরের বেশী সময় ধরে বাংলাদেশের নড়াইল এবং সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় মাছ ধরার কাজে ভোঁদড় ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে তিনটি প্রজাতির মধ্যে’ Lutra perspicillata’ নামের প্রজাতিটি মাছ শিকারে ব্যবহৃত হয়। প্রভুভক্ত এই স্তন্যপায়ী প্রানী দেখতে অনেকটা বিড়ালের মত। তবে এই প্রাণীকে মাছ ধরতে নামানোর আগে প্রশিক্ষণ দিয়ে নেওয়া হয়। প্রশিক্ষিত ভোঁদর জাল থেকে মাছ খায় না। বরং মাছের ঝাঁককে তাড়িয়ে জালের দিকে নিয়ে আসে।পুকুর, বিল কিংবা খরস্রোতা নদীতে দক্ষভাবে মাছ ধরতে পারে।

 

অক্টোবর থেকে জানুয়ারী, এই সময়ে নড়াইল, খুলনা সহ সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার জেলেরা ভোঁদড় ব্যবহার করে নদী থেকে মাছ ধরেন। মাছ ধরার জন্য জেলেরা সাধারণত দলে ভাগ হয়ে নেন। প্রতিটি দলে তিন থেকে পাঁচজন জেলে, একটি জাল এবং কম পক্ষে তিনটি ভোঁদড় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্রতিটি দলে দুটি পুর্ণবয়স্ক এবং একটি কমবয়সী ভোঁদড় থাকে।

 

প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বয়স্ক ভোঁদড় দুটিকে সাধারণত খুঁটির সাথে দড়িতে বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হয়। কমবয়সী ভোঁদড়টিকে মুক্ত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে মূলত একটি ত্রিভুজাকৃতি ক্ষেত্র তৈরী করা হয়। বয়স্ক ভোঁদড় দুটিকে দড়ির মাধ্যমে সময়ে সময়ে টান দিয়ে তাড়া দেওয়া হয়, ফলে এরা মাছের ঝাঁককে জালের দিকে তাড়া করে। মাছ ধরা শেষ হওয়ার পরে জাল গুটিয়ে নেওয়া হয়, পাশাপাশি দড়ি ধরে ভোঁদড়গুলোকেও নৌকায় নিয়ে আসা হয়। শিক্ষানবিশ ছোট ভোঁদড়টিকেও টোপ দিয়ে তুলে আনা হয়। এভাবে শিক্ষানবিশ ভোঁদড়টিকে বেশ কয়েকবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

 

মাছ ধরে আনার পরে পুরষ্কার হিসেবে ছোট ছোট মাছ ভোঁদড়দের দিয়ে দেওয়া হয়। মূলত এর মাধ্যমেই ভোঁদড়গুলো মানুষের প্রতি সহনশীল হয়ে উঠে। সহজ কথায়, এভাবেই বন্য ভোঁদর ধীরে ধীরে পোষ মানানো হয়।

 

একেকটি ভোঁদড় বেঁচে থাকে প্রায় ২০ বছর। দেখতে অনেকটা বিড়ালের মত এই প্রাণী ওজনে ৩ থেকে ৪ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। স্ত্রী ভোঁদড় প্রতি বছরে একবার তিন থেকে চারটি বাচ্চা প্রসব করে।

 

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত একটি আইন ২০১২ সালে পাস হয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, “এই আইনটি পাস হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে কোনো ব্যক্তির কাছে সংগৃহীত ও সংরক্ষিত কোনো বন্য প্রাণী থাকলে সেগুলো নিবন্ধনের আওতাভুক্ত করতে হবে”।

 

তবে আশার কথা হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক এবং গবেষক ভোঁদড়ের প্রজনন, বিস্তার এবং সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ, সাজেদা বেগম এবং মোহাম্মদ কামরুল হাসানের গবেষণা থেকে উঠে এসেছে কীভাবে ভোঁদর দিয়ে মাছ শিকার করা জেলেরা বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণীর সংরক্ষণে নীরব ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাদের গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে জেলেদের পোষা ভোঁদড়গুলো বন্য পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে।

 

সুতরাং যদি কৃত্রিমভাবে প্রজননকৃত ভোঁদড়ের একটি অংশকে প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে একদিকে যেমন ভোঁদড়টিকে তার যথাযথ প্রাকৃতিক পরিবেশে সংরক্ষণ (in-situ conservation) করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভোঁদড় পালন এবং এটি ব্যবহার করে মাছ ধরার মাধ্যমে একে তার বন্য পরিবেশের বাইরেও সংরক্ষণ (ex-situ conservation) করা সম্ভব হবে।

 

সুত্র: wikipedia, banglapedia.

 

জুড়ীনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এফপি/আরএএস