ভালো ফলাফল এবং নৈতিকতা

প্রকাশিত: ৮:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ৬, ২০২০

ভালো ফলাফল এবং নৈতিকতা

আশুক আহমদ: মানুষের জীবনে মূল্যবান এক অমূল্য সম্পদ শিক্ষা যা কখনো হারায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মানুষের অভ্যন্তরের মানুষটিকে পরিচর্যা করে খাঁটি মানুষ বানানোর প্রচেষ্টাই শিক্ষা।’ পরিপূর্ণ মানব সত্তাকে লালন করে দেহ, মন ও আত্মার সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে নিজেকে জাতির উপযোগী, যোগ্য, দক্ষ, সার্থক ও কল্যাণকামী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার নামই শিক্ষা। সকল প্রকার কুদৃষ্টি, কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে সর্বক্ষেত্রে সততা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা অর্জন শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য।

 

শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জন ডিউই বলেছেন, ‌’শিক্ষার উদ্দেশ্য আত্ম উপলদ্ধি’। প্লেটোর মত হলো, ‘শরীর ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ ও উন্নতির জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তা সবই শিক্ষার উদ্দেশ্য অন্তর্ভূক্ত’। প্লেটোর শিক্ষক সক্রেটিসের মতে, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মিথ্যার বিনাশ আর সত্যের আবিষ্কার’।

 

এরিস্টোটল বলেছেন, ‘শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যে হলো ধর্মীয় অনুশাসনের অনুমোদিত পবিত্র কার্যক্রমের মাধ্যমে সুখ লাভ করা’। শিক্ষাবিদ জন লকের মতে, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সুস্থ দেহে সুস্থ মন প্রতিপালনের নীতিমালা আয়ত্বকরণ’।ভবিখ্যাত শিক্ষাবিদ হার্বার্ট বলেছেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে শিশুর সম্ভবনা ও অনুরাগের পূর্ণ বিকাশ ও তার নৈতিক চরিত্রের প্রকাশ’।কিন্ডার গার্টেন পদ্ধতির উদ্ভাবক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ফ্রোয়েবেল এর মতে : শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সুন্দর বিশ্বাসযোগ্য ও পবিত্র জীবনের উপলব্ধি।

 

কমেনিয়াসের মতে, ‘শিশুর সামগ্রিক বিকাশই শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। আর মানুষের শেষ লক্ষ্য হবে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে সুখ লাভ করা’। পার্কার বলেছেন, ‘পূর্ণাঙ্গ মানুষের আত্ম প্রকাশের জন্যে যেসব গুনাবলী নিয়ে শিক্ষার্থী এ পৃথিবীতে আগমন করেছে, শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সেসব গুনাবলীর যথাযথ বিকাশ সাধন’।

ডা. হাসান জামান বলেছেন, ‘প্রত্যয় দীপ্ত মহত জীবন সাধনায় সঞ্জিবনী শক্তি সঞ্চার করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য’। ড. খুরশীদ আহমেদের মতে, ‘স্বকীয় সংস্কৃতি ও আদর্শের ভিত্তিতে সুনাগরিক তৈরি করা এবং জাতির ধর্ম ও সংস্কৃতিক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন হওয়া উচিত শিক্ষার উদ্দেশ্য’। আল্লামা ইকবালের মতে, ‘পূর্ণাংগ মুসলিম তৈরি করাই হবে শিক্ষার উদ্দেশ্য’।

 

নৈতিকতা (লাতিন শব্দ “মোরালিটাস”, যার অর্থ চরিত্র, ভদ্রতা, সঠিক আচরণ) হল ভাল (বা সঠিক) এবং খারাপ (বা ভুল) বিষয়সমূহের মাঝে উদ্দেশ্য সিদ্ধান্ত ও প্রতিক্রিয়াসমূহের পার্থক্য ও পৃথকিকরণ। নৈতিকতাকে একটি আদর্শিক মানদন্ড বলা যেতে পারে যা বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিকতা, ঐতিহ্য, সংষ্কৃতি, ধর্ম প্রভৃতির মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আবার অনেক ক্ষেত্রে, সামগ্রিকভাবে সমগ্র পৃথিবীর জন্য কল্যাণকর বিষয়সমূহকেও নৈতিকতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। (তথ্যসূত্রঃঃ উইকিপিডিয়া)।

 

নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিনির্মাণের উপাদান হলো শিক্ষা, কারখানা হচ্ছে শিক্ষাঙ্গন আর শিক্ষক হলেন এর আদর্শ কারিগর। একটি সুস্থ, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ মানুষের বসবাস উপযোগী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিক মূল্যবোধের কোনো বিকল্প নেই। নীতি-নৈতিকতার অনুপস্থিতি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবেশ সর্বত্র মানবজীবন ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। নীতি নৈতিকতার বলেই মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের মর্যাদা লাভ করে। নীতি নৈতিকতার গন্ডির মধ্যে যাদের চলাচল তারাই সত্যিকারের মানুষ। আর যারা নীতি বিসর্জন দিয়ে জীবন যাপন করে তারা মানুষের আদলে গড়ে উঠা অমানুষ।

 

নীতি নৈতিকতা আজ আমাদের কাছে মূল্যহীন এর চাহিদা আর প্রয়োজনীয়তা যেন দিন দিন কমছে। এক সময় মানুষের সম্মান বিবেচিত হতো নৈতিকতা দিয়ে। কিন্তু আজ সম্মান বিবেচিত হয় টাকা আর প্রতিপত্তি আর পেশীশক্তি দিয়ে। নীতি নৈতিকতার এই নতুন সংস্করণ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কোথায় নিয়ে যাবে- একথা ভাবতে গেলে মনে অজানা এক আতংক বিরাজ করে । মানুষ এখন মানবতা, মনুষ্যত্ব, সততা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ- চর্চা করে না বা তার উত্তরসুরিদের ও এসবে অভ্যস্ত করে না, এ গুন গুলো মানুষের কাছে অনেকটা অপ্রিয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এগুলো নিয়ে পড়ে থাকলে প্রভাব প্রতিপত্তি ধরা দেবে না, কাড়ি কাড়ি টাকার পাহাড় বানানো যাবে না, তথাকথিত স্বপ্ন পূরণের বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এভাবে চলতে থাকলে গোটা সমাজ কলুষিত হবে, বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে।

 

আমাদের সন্তানরা নৈতিকতা শিক্ষা পাবে তার পরিবারে, সমাজে ও শিক্ষালয়ে। কিন্তু এসব ক্ষেত্র থেকে সে কতটুকু পাচ্ছে? আজ বাচ্চাদের মধ্যে মানবিক গুনাবলী বিকশিত করার চেয়ে তাদেরকে দিয়ে ‘এ প্লাস’ সর্বস্ব সার্টিফিকেট অর্জন করাতে অভিভাবক এমনকি শিক্ষকরা ও ব্যস্ত। জিপিএ-৫ পাওয়া বা ক্লাসে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হওয়া জরুরি। কিন্তু সেটা একমাত্র বিবেচনার বিষয় হতে পারে না। পরবর্তী প্রজন্ম ভালো মানুষ হলো কিনা, তাদের মধ্যে মানবিকতাবোধ, নৈতিকতাবোধ আছে কিনা, সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে কিনা, সুস্থ, সুন্দর মন নিয়ে বড় হচ্ছে কি না সেটা সবার আগে বিবেচনার বিষয়। পাস করা আর মানুষের মতো মানুষ হওয়া এক না। সার্টিফিকেট অর্জন করার চেয়ে মানবিক গুনসম্পন্ন মানুষ হওয়া কঠিন।

 

প্রকৃত মানুষ সে যার মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, নীতি আদর্শ, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও নৈতিকতা আছে। কিন্তু আমাদের কাছে আজ এসব গুনাবলী গুরুত্ব হারিয়েছে। আমরা আমাদের সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আর সরকারি-বেসরকারি উচ্চ পদস্থ চাকরিজীবী বানাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ প্রচেষ্টার পাশাপাশি সন্তানকে মানুষ হওয়ার এবং নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার গুরুত্ব অনুভব করি না। বাচ্চাদের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করানো আজ প্রধান চ্যালেঞ্জ। নৈতিক শিক্ষা না দিয়ে আজ পরিবার,সমাজ এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনৈতিকতা শিক্ষা দিচ্ছে।

 

কিছু বাস্তব উদাহরণ দিলে একথার যৌক্তিকতা পাওয়া যাবে। কয়েক বছর আগে যখন প্রশ্নপত্র ফাসের হিড়িক পড়েছিল। সে মওসুমে পরীক্ষার্থীর বাবা-মা, শিক্ষক, আত্মীয় স্বজনরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে ফাস হওয়া সেই প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন যাতে ঐ বাচ্চাটি ভালো ফলাফল অর্জন করে। এ অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিসিএস থেকে নিয়ে একেবারে প্রথম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার বেলায়ও ঘটেছে। এর দ্বারা হয়তো সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল ভালো হয়েছে কিন্তু সন্তান কি শিখলো? জীবন যুদ্ধে নিজ স্বার্থ অর্জন করতে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া যায় এমন বার্তা পেয়ে সে বেড়ে উঠবে। বাচ্চা বাইরে দুষ্টমি করে এসেছে, পরিবার থেকে শিখিয়ে দেয়া হচ্ছে অন্যদের সামনে সে কিভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ঘটনার বর্ণনা দেয়।

 

শিক্ষক অনেক সময় তার শিক্ষার্থীর অপকর্ম ঢাকার কৌশল হিসেবে মিথ্যা কথা বলানোর শিক্ষা দিচ্ছেন। সমাজের মুরব্বিদের সামনে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে যখন বেয়াদব উপাধি দেওয়া হয় তখন কোমলমতি ছেলে বা মেয়েটি আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না। অন্যায়কে ন্যায় বিবেচনা করে সে বেড়ে উঠে। এক সময় অভিভাবক তার বাচ্চাদের নিয়ে এসে উস্তাদের কাছে বলতেন এদেরকে মানুষ করে দিবেন আর এক্ষেত্রে যে শাসন প্রয়োজন তা প্রয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করবেন না। কিন্তু আজ শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনৈতিক আচরণের কারণে শাসন করলে আজ সে ছাত্র-ছাত্রীর অভিভাবক, আত্মীয়-স্বজন তেড়ে আসেন শিক্ষকের বিচার করতে। এ ধরনের অনেক উদাহরণ আছে যা গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে আমাদের এ প্রজন্ম নৈতিক শিক্ষা তেমন একটা পচ্ছে না বরং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমরা তাদেরকে অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করতে উৎসাহিত করছি।

 

কোন ব্যক্তি যদি চলাচলের সময় রাস্তায়, বাজারে, যানবাহনে বা যেকোনো স্থানে তার টাকা পয়সা বা মূল্যবান কোন জিনিস ফেলে যায় আর কেউ পেয়ে মালিককে ফিরিয়ে দেয় তবে সাথে সাথে নিউজ শিরোনাম হয় “সততার বিরল দৃষ্টান্ত”। কেন এমন নিউজ হবে? যে পেয়েছে তা ফিরিয়ে দেওয়া তার দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের নৈতিকতা আজ তলানিতে পড়ে আছে। এখন কারো কিছু পাওয়া গেলে ফিরিয়ে না দেওয়াই স্বাভাবিক বিষয়, ফিরিয়ে দেওয়া অস্বাভাবিক বা আশ্চর্যজনক কাজ মনে করে মিডিয়ায় প্রকাশ হয়। একজন অফিসার উনার অফিস সংশ্লিষ্ট জনগণের সেবা দিবেন, জনগণ সেবা ভোগ করবে সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু বাস্তবতা এর বিপরীত। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।

 

আমাদের শিক্ষার্থীদের সবসময় নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তবে কেন তারা পদস্থ কর্মকর্তা হয়ে দুর্নীতি করবে? আগেকার দিনে পাঠ্যপুস্তক থেকে যা শিখানো হত শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতো। এখন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে চাকরির আশায় আর পরীক্ষার জন্য যা পড়ে তা পাশ করা বা ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য। মা বাবা ও তাদের সন্তানদের ভালো ফলাফল অর্জন কে প্রাধান্য দেন, নৈতিকতার তেমন ধার ধারেন না। এতে করে তাদের মধ্যে নৈতিকতা জন্মায় না। ছোট বেলা থেকেই শিখানো হয় “লেখা পড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে”। সন্তানরা ও বড় হয়ে চাকরিতে যোগদানের পর বৈধ-অবৈধটার বাছ বিচার না করেই গাড়ি ঘোড়ার মালিক হওয়ার কুচেষ্টা শুরু করে। এর পরিনতি? ভয়াবহ, ভয়ানক!

 

আজ নৈতিকতা অর্জনের জন্য আলাদা ভাবতে হচ্ছে, অথচ লেখাপড়া করলে জ্ঞান অর্জনের সাথে নৈতিকতা ও অর্জিত হওয়ার কথা, তবে হয় না। শিক্ষা মানুষকে শিক্ষিত করছে ঠিক কিন্তু সর্বদা সুশিক্ষিত করতে পারছে না। শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে হবে নৈতিকতার সাথে জ্ঞানার্জন, এ প্লাস পাওয়া বা ভালো চাকরি পাওয়া নয়। আমাদের মধ্যে এমন মানসিকতার উদ্রেক হলেই কেবল নৈতিকতাপূর্ণ সমাজ আশা করতে পারি।

 

লেখক: প্রধান শিক্ষক, দক্ষিণ ভাগ এনসিএম উচ্চ বিদ্যালয়। বড়লেখা,মৌলভীবাজার।