আমাদের কথা আর কাজ

প্রকাশিত: ১১:০০ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২০

আমাদের কথা আর কাজ

আশুক আহমদ: নেতাকে আমরা ফুলের মতো পবিত্র (বাস্তবতা ভিন্ন) এমন চরিত্রের অধিকারী ভূষিত করে তৈলাক্ত স্লোগান দিয়ে বক্তৃতার মঞ্চে উঠানোর পর তিনি দেশপ্রেমের কথা বলেন অথচ তিনি নিজেই বিদেশি ভোগ্য পন্য ব্যবহারে অভ্যস্ত। সততা সম্পর্কে মানুষকে ছবক দিয়ে নিজেরাই অর্থ লুট করি, চুরি করি, ঘুষ খাই। প্রতিবেশীর হক নষ্ট করে এসে মানুষের অধিকারের কথা বলে নিজেকে মানবাধিকার কর্মী হিসেবে জাহির করি। নির্বাচনে জনগণের খেদমত করার ম্যান্ডেট নিয়ে এসে জনসেবা তো নয়ই উল্টো জনদুর্ভোগ বাড়াই এবং নিজসেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। দুই পক্ষের বিবাদ মেটাতে গিয়ে “চোর কে বলি চুরি কর, মালিককে বলি সজাগ থাকিস” নীতি প্রয়োগ করি। নিজে মাদক সেবন করে, সিগারেট ফুঁকে, মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্টপোষকতা করে আমরা সেমিনারে মাদকের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করি। শ্রমিকদের বেতন মেরে, বকেয়া পাওনা অথবা ন্যায্য মজুরি না দিয়ে শ্রমিক দিবসে তাদের অধিকার নিয়ে ঝাঁঝালো বক্তৃতা দেই। যৌতুক নিয়ে বিয়ে করে যৌতুক বিরোধী র‍্যালিতে অংশ নেই। শ্বশুর বাড়িতে থেকে যৌতুক বাবদ প্রাপ্ত মোটরসাইকেলে চড়ে এসে শিক্ষক ক্লাসে পড়াচ্ছেন যৌতুক প্রথা একটি অভিশাপ। আবার ধুমপায়ী শিক্ষক মহাশয় জর্দা মেশানো পান চিবিয়ে চিবিয়ে ধুমপান, জর্দা ও নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণের কুফল ও ক্ষতিকারক দিক সবিস্তারে আলোচনা করেন। একহাতে জলন্ত সিগারেট নিয়ে অন্যহাত দিয়ে ডাক্তার সাহেব রোগীর পরামর্শ পত্রে ধুমপান না করার সতর্কবার্তা লিখে দিচ্ছেন। আগে সালাম দেওয়ার, দান খয়রাতের ফজিলত বর্ননাকারী হুজুর নিজে কখনো কাউকে আগে সালাম করেন বা দান খয়রার করেন তেমন একটা চোখে পড়ে না। মা বাবার অবাধ্য সন্তান মা দিবসে/ বাবা দিবসে ফেসবুকে এমন স্ট্যাটাস দিবে মনে হবে এ সন্তানের মা-বাবার মতো ভাগ্যবান দুনিয়ায় ক’জন আছে। দল-মত-জাতি-ধর্ম-বর্ন নির্বিশেষে সকল মানুষ সমান বলা লোকটার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক চিন্তা ভাবনা বিরাজমান। ‘মিথ্যা বলা মহা পাপ’ ছবক দিয়ে দিন-রাত নিজেরাই সেই ‘মহা পাপ’ করতে থাকি। সত্য কথায় যেন এলার্জি। অনেকেই সেমিনারে পথশিশুর অধিকার নিয়ে কথা বললেও তার বাড়িতে যে শিশুটি আছে, দেখা যাবে সে ই অধিকার বঞ্চিত। নিজ বাসায় দু চারজন শিশু কাজের জন্য নিয়োজিত করা ভদ্রলোক শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কথা বলেন।

 

ধর্মগুরুরা আমাদের ইহজাগতিক ও পরকালীন কল্যাণের জন্য ধর্মজ্ঞান দিয়ে থাকেন, বিশ্বাস দৃঢ় করার উপায় বাতলে দেন , সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের উপায় বলে দেন। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তাদের অনেকেই অবলীলায় স্ববিরোধী কাজ করে বেড়ান। অন্যদেরকে যা করতে বলেন, তারা তা করেন না বলে তাদের কথায় মানুষের মধ্যে খুব একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না।

 

আবার অনেক মুসল্লী আছেন যারা ইমাম সাহেবের অল্পতেই তুষ্ট থাকা ইসলামের শিক্ষা বা খলিফা উমর (রা.) অর্ধেক পৃথিবীর শাসক হয়েও সাধাসিধে জীবন যাপন করেছেন এমন বক্তব্য শুনে গা কাপিয়ে বলে উঠেন ‘সুবহানাল্লাহ ‘আলহামদুলিল্লাহ’। বাস্তব জীবনে কাউকে এমন জীবন যাপন করতে দেখলে ঐ মুসল্লীরাই সমালোচনা করে। পরকালে অবিশ্বাসী অনেক জাত নাস্তিকরাও তাদের স্বজন বা প্রিয়জনের মৃত্যুতে ‘জান্নাতুল ফেরদাউস’ ‘স্বর্গবাসী হোক’ বলে বাণী পাঠান। এটা তাদের দ্বৈত মানসিকতারই প্রকাশ।

 

সভ্যতার চূড়ান্ত পর্যায়ে এখন আমাদের অবস্থান এজন্য আমাদের ভোগবাদী মানসিকতা বেড়ে জীবন বিলাসী হয়ে গেছে। আমাদের এই যে এতো দ্বিমুখী নীতি ও বিশ্বাসের কপটতা তার মূলে রয়েছে ভোগবাদী এবং বিলাসী জীবন যাপন করার মানসিকতা। ত্যাগের চেয়ে গ্রহণের প্রতিযোগিতায় আমরা এগিয়ে,শুধু খাই খাই আর চাই চাই- দেই দেই নয়। আমাদের মনস্তাত্ত্বিকতা দিন দিন সুন্দর আবরণে জটিল ও কুটিল রূপ ধারণ করছে। এতে স্খলন ঘটছে আমাদের বিশ্বাস ও নীতির, দংশিত হচ্ছে আমাদের সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র। রাজনীতিক, ধর্মগুরু, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষক, লেখক, ডাক্তার, সংস্কৃতিকর্মীসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ বিশ্বাস ও নীতির দিক থেকে দ্বিমুখী মনোভাব পোষণ করছে।

 

আমরা যা বিশ্বাস করি, তা বলি না বা করি না। আবার যা করি বা বলি, তা বিশ্বাস করি না। এই দ্বৈতনীতির অবলম্বনকারীরা বোকা বা চালাক নয়- সুবিধাবাদী। আমরা যেন কাজে নয়, কথায় বিশ্বাসী। কাজে না বড় হয়ে কথায় বড় হতে চাই।

 

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন: ‘আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি তা পালন করি না; ভূরি পরিমাণ বাক্যরচনা করিতে পারি; তিলপরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতালাভের চেষ্টা করি না;… পরের চক্ষে ধূলিনিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিকস্, এবং নিজের বাক্চাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য’। (সূত্র: চারিত্রপূজা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

 

সমাজে অনেক মানুষ আছেন যাদের কথা ও কাজে ভারসাম্য নেই এবং তাদের ধারণা কথা ও কাজের ভারসাম্যহীন এই আচরণ কেউ কখনও বুঝতে পারবে না। এরা কখনও কারো অন্তর থেকে ভালোবাসা কিংবা শ্রদ্ধা পায় না, পরকালীন জীবনে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। যারা নিজেরা যা বলে তা করে না, তাদের প্রতি আল্লাহর রয়েছে প্রচণ্ড ক্রোধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা যা বলো তা নিজেরা করো না কেন? আল্লাহর নিকট অত্যন্ত ক্রোধ উদ্বেগকারী ব্যাপার এই যে, তোমরা যা বলো তা বাস্তবে করো না।’ -সূরা আস সফ: ২।

 

আল্লাহ আমাদেরকে একটি মুখ দিয়েছেন যাতে কথা কম বলি কিন্তু হাত, কান ও চোখ দু দুটো করে দিয়েছেন যাতে বেশি বেশি দেখি, শুনি ও কাজ করি। তাই আমরা কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী হয়ে সমাজ, জাতি তথা দেশের কল্যাণে কাজ করব।

 

লেখক: প্রধান শিক্ষক, দক্ষিণভাগ এনসিএম উচ্চ বিদ্যালয়। বড়লেখা, মৌলভীবাজার।