রহস্যময় ইস্টার আইল্যান্ড

প্রকাশিত: ৯:১১ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০২০

রহস্যময় ইস্টার আইল্যান্ড

রাহাত আশরাফ শাওন: ধরুন, আপনি নতুন এক দ্বীপে নোঙর ফেললেন, আর দ্বীপে নামতেই আবিষ্কার করলেন বিশাল বিশাল কিছু মূর্তি, মূর্তির আবার পুরোটা না, কেবল ধর কিংবা শুধু মাথা। ভাবতে পারছেন? বাস্তবেই এমন একটা দ্বীপ রয়েছে, আর তারই নাম ইস্টার আইল্যান্ড।

 

শত শত বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং সুকৌশল শিল্প-সংস্কৃতিতে ঘেরা চিলির দ্বীপ ‘ইস্টার আইল্যান্ড’। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপটিতে মূলত দক্ষিণ আমেরিকার আদি পলিনেশিয় জাতি রাপা নুইয়ের বাসস্থান। এজন্য এটি রাপা নুই নামেও পরিচিত। দ্বীপটির বিশেষ ধাঁচের তৈরী মোয়াই মূর্তিগুলো দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটে ইস্টার আইল্যান্ডে। প্রায় ৯০০টি ভাস্কর্য বা মোয়াই রয়েছে ইস্টার আইল্যান্ড জুড়ে। এ দ্বীপের আদিবাসীরা সম্ভবত ৭০০ থেকে ১১০০ সালের মাঝে এখানে এক সুন্দর সমাজ গড়ে তুলেছিল, কার্বন ডেটিং অন্তত তাই জানায় আমাদের।

 

৬৬ বর্গমাইলের এই ছোট্ট ত্রিভুজাকৃতির দ্বীপটিতে অস্টাদশ শতকের গোড়ায় ইউরোপীয় নাবিকরা যখন প্রথম পদার্পণ করল, তখন তারা দেখতে পেলো যে পুরো দ্বীপের সমুদ্রের ধার ঘেঁষে শত শত প্রকাণ্ড প্রস্তর মূর্তি। কে বা কারা বানিয়ে রেখেছে তা কোথাও লেখা নেই। মূর্তিগুলো ১৫ থেকে ২০ ফুট চওড়া। প্রায় দশ তালা বাড়ির সমান উঁচু এবং ওজন ১০ থেকে ২৫০ টনেরও বেশি। ইস্পাতের মত কঠিন শীলাকে কাটা হয়েছে মাখন কাটা করে। ১০ হাজার টন ওজনের সব পাথর পড়ে আছে এখানে ওখানে। তাদের আর চাঁছা ছেলা করা হয়ে ওঠেনি।

 

৩৩ থেকে ৬৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা আর প্রায় ৫০ টন ভারী শত শত মূর্তি আজও চেয়ে থাকে পর্যটকদের মুখের দিকে বুক ফুলিয়ে। এই দ্বীপটির নামকরণ করেন একজন ডাচ অভিযাত্রী। ১৭২২ সালের এপ্রিল মাসে এই দ্বীপটি প্রথম গোচরে আসে এবং ওই দিন ছিল খ্রিস্টানদের পবিত্র স্টার দিবস। তাই দ্বীপটির নামকরণ করা হয় স্টার দ্বীপ। দ্বীপের পরিধি জুড়ে ২৫ কিলোমিটার পর পর রাখা হয়েছে আহু। আহু দ্বারা প্রায় পুরো দ্বীপটিকেই আবর্তিতি করা হয়েছে। প্রত্নতক্তবিদ ভ্যান্টিল বারগ ১৯৮৯ সালে এই দ্বীপ জুড়ে এক জরিপ চালান, তার জরিপে দ্বীপটিতে মোট ৮৮৭টি মুয়াই পাওয়া যায়। প্রাপ্ত মুয়াইয়ের মাঝে ২৮৮টিকে বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত আহুতে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায়। বেশিরভাগ মুয়াই যে যে খনি থেকে তৈরি করা হয়েছিল তার নাম রানু রারাকু। রানু রারাকুতে স্থানান্তরিত রুপে বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় পড়ে থাকতে পাওয়া যায়। বাকি আহুগুলো দ্বীপের অন্যান্য স্থানে পাওয়া যায়। এইগুলোর বেশিরভাগ মূর্তির মাথা পুরো মূর্তিটির পাঁচ ভাগের তিন ভাগ। সবচেয়ে বড় মুয়াই যা রানু রারাকু কারখানায় রয়ে গেছে তার নাম হলো এলজি গেন্টি। এর উচ্চতা আনুমানিক ৭১.৯৩ কিলোমিটার এবং এর ওজন আনুমানিক ১৬৫ তন।

 

আহুতে দাঁড় করানো মুয়াই এর মাঝে সবচেয়ে বড়টি হলো পারু। যার উচ্চতা ৩২.৬৩ ফুট এবং আনুমানিক ওজন ৮২ টন। অবশ্য আহু হিংগাটি তিংগাতে ৩৩.১০ ফুট একটি মুয়াই স্টার বাসি নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু দাঁড় করানোর সময় এটি পড়ে যায়। সব চেয়ে ছোট মুয়াইটি আছে ইউকে। এটির উচ্ছতা ৩.৬ ফুট। ক্যাপ্টেন রগে বিন স্টার এ নেমে দ্বীপে স্থাপিত বিশাল আকার স্থাপতিগুলো দেখে অবাক হয়ে যান। কারণ তিনি দ্বীপটি প্রায় বৃক্ষ শুন্য অবস্থায় দেখতে পান। হাজার দুয়েক মানুষ এবং তাদের তৈরি একদম হালকা ধাঁচের কিছু মাছ ধরার নৌকা দেখেন তিনি। তিনি কিছুতেই ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না এরকম একটি অনগ্রসর দ্বীপবাসীর পক্ষে পাথর খোদাই করে কি করে এত বিশাল মূর্তি বানানো সম্ভব হয়েছিল।স্টার বাসীর ছিল না পাথর কাটার কোন আধুনিক যন্ত্রপাতি। যা দ্বারা তারা এত বিশাল পাথর খোদাই করতে পারবে। ছিল না কোন আধুনিক যান, যার দ্বারা তারা রানু রারাকু কারখানা থেকে মুয়াইগুলোকে নানা স্থানে স্থাপিত আহুতে নিয়ে যাবে বা ছিল না কোন ক্রেন যা দ্বারা তারা আহুতে মুয়াই স্থাপন করবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানোর জন্য যত মানুষ দরকার এবং খাবারের দরকার তা ছিল না স্টার দ্বীপে। ছিল না কোন বড় গাছ। তাহলে তারা কিভাবে এই মূর্তি বানালো। আর কেনইবা এত বড় মূর্তি বানালো। তাছাড়া পরিস্থিতিটা আরও রহস্যময় করেছিল সেই খানের আদি বাসিন্দারা। তাদের কথা অনুযায়ী, পাথর খোদাই করার পর পুরোহিতরা মানা নামে এক আধ্যাত্মিক ক্ষমতার বলে মুয়াইকে হেটে আহুতে চলে যাবার নির্দেশ দিত এবং তারা চলেও যেত। এছাড়া দ্বীপটির প্রাচীন নাম নেবেল অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড ও আইচ লুকিং এট হেভেন।

 

স্টার দ্বীপে ১১টির মতো গোষ্ঠি ছিল। যারা হয়ত একজন আরেক জনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। মূর্তি অসমাপ্ত রাখার কারণ হল ততদিনে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যাওয়া এবং এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালাতে গিয়ে দ্বীপের বৃক্ষ ও খাদ্য ভান্ডার শেষ করে ফেলা। পরিবেশের বিপর্যয় হওয়ায় স্টার দ্বীপে খাদ্যের অভাব দেখা দিল। সম্পদের অপচয় পুরোদমে চালু ছিল কিন্তু সে প্রাকৃতিক সম্পদ নতুন করে সৃষ্টি হচ্ছিল না। ফলে জনসংখ্যা সাংঘাতিক রকম কমে আসে। এভাবে দ্বীপটি জনশূন্য হয়ে পড়ে।

 

ইস্টার আইল্যান্ডের মূর্তিগুলো সবই তৈরি হয়েছে বিশাল পাথর কুঁদে বা কেটে। কিন্তু গবেষকদের প্রশ্ন হল এই দ্বীপ বাসীরা সেই কৌশল শিখলো কি করে? আর পাথরগুলোই তারা বয়ে আনলো কিভাবে এবং কোথা থেকে? এ ব্যাপারে দ্বীপবাসীদের কেউ কিছু জানেনা। অথচ যুগ যুগ ধরে এই মূর্তিগুলো ইস্টারদ্বীপেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ফলে এ বিষয়টি নিয়ে অভিযাত্রী দলের সকলেই অবাক হলেন। এরপর ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে এই রহস্যের কথা ছড়িয়ে পড়লো। ইস্টার আইল্যান্ড নিয়ে শুরু হল গবেষণা। কিছু কিছু গবেষক এ ব্যাপারে তথ্য দিয়েছেন ভিন্ন ভাবে। এরই মধ্যেই আবার এই একই দ্বীপের আবিষ্কৃত হল কিছু কাঠের বোর্ড, যার ওপর লেখা আছে আশ্চর্য সব লিপি যার পাঠোদ্ধার করতে দ্বীপের মানুষেরা তো বটেই, বড়ো বড়ো পন্ডিতরা পড়তে ও অক্ষম হলেন। এগুলোর নাম দেয়া হল রং গোরগো।

 

তথ্যসূত্র: ১) Easter Island at ২) Terevaka Archaeological Outreach (TAO) – Non-profit Educational Outreach & Cultural Awareness on Easter ৩) Easter Island – The Statues and Rock Art of Rapa Nui – Bradshaw Foundation / Dr Georgia Lee ৪) Chile Cultural Society – Easter Island ৫) Rapa Nui Digital Media Archive—Creative Commons–licensed photos, laser scans, panoramas, focused in the area around Rano Raraku and Ahu Te Pito Kura with data from an Autodesk/CyArk research partnership ৬) Mystery of Easter Island – PBS Nova program ৭) Current Archaeology’s comprehensive description of island and discussion of dating controversies