একজন চৌকস কর্মকর্তার বিদায়

প্রকাশিত: ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

একজন চৌকস কর্মকর্তার বিদায়

মাহফুজ শাকিল: চাকুরীতে যোগদানের পর থেকে নিজের দক্ষতা ও দূরদর্শিতা দিয়ে একের পর এক ভালো কাজ করেছেন তিনি। যার জন্য বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুঁড়িয়েছেন। প্রায় তিন বছর সময় ধরে জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে কর্মরত ছিলেন অসীম চন্দ্র বণিক। সম্প্রতি পদোন্নেতি পেয়ে চাঁদপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নিযুক্ত হয়েছেন। আগামী সপ্তাহে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

 

জুড়ীতে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে অসংখ্য ভাল কাজের অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি। বিদায় বেলায়ও মানবিক কাজ করে যেতে ভূলে যাননি সরকারের মাঠ প্রশাসনের এই চৌকস কর্মকর্তা। তাঁর চলে যাওয়ার মুহুর্তেও কয়েকজন অস্বচ্ছল ব্যক্তিকে কর্মসংস্থানের জন্য আর্থিক অনুদান দিয়ে আরও একটি ভালো কাজের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গেলেন। মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ ২৯ জুন অসহায় তিনজন মানুষের মাঝে জনপ্রতি ৯ হাজার ৮০৭ টাকা করে প্রদান করেছেন।

 

বিদায়ী ইউএনও অসীম চন্দ্র বনিকের পদোন্নতি পাওয়ার পর বিদায় বেলায় জুড়ীতে পেয়েছেন অনেক বিদায়ী সংবর্ধনা। মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি জেলা চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যক্তিগত পক্ষ থেকেও দেয়া হয়েছে সংবর্ধনা। জুড়ী উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও উপজেলার সকল জনপ্রতিনিধি, জুড়ী তৈয়বুন্নেছা সরকারি কলেজ, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা ও উপজেলা স্কাউট্স, জুড়ী শিল্পকলা একাডেমী, জুড়ী উপজেলা প্রেসক্লাব, জুড়ী টাইমস ও জুড়ী সাংবাদিক সমিতি, গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচী (গ্রাউক), প্রভাত টিভিসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ তাঁকে করোনাকালীন সময়ে সামাজিক দূরত্ব রেখে সংবর্ধনা দিয়ে সম্মান দেখিয়েছে।

 

সোমবার বিকেলে জুড়ী থেকে ঢাকায় ফেরার পথে তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক টাইমলাইনে ‘বিদায় জুড়ী’ বলে একটি আবেগগণ স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘জুড়ীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে কাজ করেছি দুই বছর আট মাস সাতাশ দিন। জুড়ীতে কাজ করে এই উপলব্ধি হয়েছে যে, জীবন অনেক সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, সাধারণ মানুষের শক্তি অসাধারণ। কখনই অন্যের কথায় অন্যায় কাজে জড়িত হওয়া যাবে না। অন্যায় যেই করুক সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা স্পষ্ট অবস্থান তৈরি করতে হবে। এটাই জীবনের সৌন্দর্য। আমি তারুণ্যের শক্তির পক্ষে। ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। ভালো থাকুক আমাদের সকলের ভালোবাসার জুড়ী। ভালো থাকুক জুড়ীর জনগণ।’

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী, ২৯তম বিসিএস ক্যাডারের এ চৌকস কর্মকর্তা ২০১১ সালের ১ আগস্ট কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখান থেকে ২০১৪ সালে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগ দেন। ২০১৬ সালে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে যোগ দেন। এরপর ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে জুড়ী উপজেলায় যোগদান করেন।

 

জুড়ীতে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাহসিকতার মধ্যে দিয়ে শত বাঁধা পেরিয়ে সৃষ্টিশীল ও ব্যতিক্রমী কর্মযজ্ঞ করে উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন এবং সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত হন। জুড়ীতে তাঁর কর্মকালীন সময়ে প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জুড়ী নদী পুণঃখনন, বালু মহাল লিজ, শতবর্ষী বাজার উদ্ধার, জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসন, পাহাড়-টিলা কাটার বিরুদ্ধে অভিযান, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও নিজের বেতনের টাকায় হাকালুকি হাওরে বোরো ধান কাটায় নিয়োজিত চারশ’ শ্রমিককে খাবার খাওয়ানোসহ বেশ কয়েকটি সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশব্যাপী আলোচিত হন তিনি।

 

তাঁর কর্মকালীন সময়ে বিশেষ করে জলাবদ্ধতা নিরসনে জুড়ী চৌমুহনী থেকে জুড়ী নদী পর্যন্ত অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে দেড় কিলোমিটার খাল খনন ছিল আলোচিত। রেলপথের অবৈধ জায়গা উচ্ছেদ করে প্রায় ২৫ হাজার লোকের দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর করেন। জুড়ী হাসপাতালের ভেতরে একটি ঘর নিয়ে এক ব্যক্তির করা মামলা উচ্চ আদালতে মোকাবেলা করে হাসপাতালটি চালু করেন এবং ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে উপজেলাকে রাখেন শতভাগ নকলমুক্ত। শহরের দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। জুড়ী শহরের প্রধান সমস্যা জুড়ী শিশু পার্ক ও পোস্ট অফিস সংলগ্ন অবৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী কামিনীগঞ্জ বাজারে স্থানান্তর করে শতবর্ষী মৃত বাজারকে জীবিত করে ব্যাপক প্রশংসিত হন। এই বাজার বর্তমানে ৭০ লক্ষ টাকা সরকারিভাবে ইজারা প্রদান করা হয়। উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে তাঁর প্রয়াস ছিল সর্বদা। সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে জিরো ট্রলারেন্স ছিলেন তিনি। এছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবাধে পাহাড় ও টিলা কাটার বিরুদ্ধে অভিযান করে আদায় করেছেন লক্ষ লক্ষ টাকার জরিমানা। সরকারি ধান ক্রয়ে সিন্ডিকেট চক্র ও হাট-বাজার সিন্ডিকেট চক্র ভেঙে দেন। জুড়ী নদীর বালুমহালে রাজস্ব ছাড়া বালু উত্তোলনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র ভেঙে দিয়ে ফিরিয়ে আনেন সরকারের লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব। এখন প্রতিবছর সরকার এই বালু মহাল থেকে ৭০-৮০ লক্ষ টাকা ইজারা পাচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে দেড় কোটি টাকার প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুমোদন করিয়েছেন। উপজেলার ভেতরে ও উপজেলা সদরের স্টেশন রোডে জরাজীর্ণ রাস্তাঘাট, ড্রেনসহ বিভিন্ন কাজে ৫ কোটি টাকার বরাদ্দ এনেছেন; যা উপজেলা পরিষদের বহির্ভূত বরাদ্দ। জেলা পরিষদের অর্থায়নে উপজেলার পুকুরপাড়ের সৌন্দর্য্য বর্ধনে ঘাটলা তৈরি, আধুনিক রেস্টহাউস নির্মাণ, উপজেলার জরাজীর্ণ অফিস দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিকায়ন করেছেন তিনি।

 

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এবং উপজেলার মানুষকে নিরাপদ রাখতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত মাঠে থেকে বিরামহীনভাবে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। সরকারের ত্রাণ কর্মহীন অসহায় মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে গেছেন মানুষের বাড়ি বাড়ি। সুষ্টু ও সুন্দরভাবে করেছেন প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তার তালিকা। সামাজিক দূরত্বের নিয়ম বাস্তবায়নে সকাল থেকে রাত অবদি ছিলেন রাস্তায় রাস্তায়, হাটে বাজারে। করোনা শনাক্তের সংবাদ পেয়ে রাত দিনের হিসেব না করে ছুটেছেন আক্রান্তের বাড়ী। লকডাউনে থাকা পরিবারে নিজে গিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন ফলমুল ও খাবার। বাজার মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাজে অনেকদিন কাকডাকা ভোরে বের হয়েছেন- ফিরেছেন রাত দশটার পর। এরকম শত দৃশ্যের স্বাক্ষী জুড়ীর গণমাধ্যম কর্মীরা। যে কেউ নক করলে সাড়া দেয়ার বড় গুণটি ছিল তাঁর।

 

জনদরদী, মানবিক ও সৃষ্টিশীল এসব কাজের জন্য জুড়ীর মানুষ একজন ‘জননায়ক’ হিসেবেও আখ্যায়িত করতেন তাঁকে। তিনি জুড়ীবাসীর মন জয় করেছেন ভালোবাসা দিয়ে, শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন কর্তব্যপরায়নতা দিয়ে। সাহসী ভূমিকা নিয়েছেন অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে। উপজেলার মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সংকট-সম্ভাবনা সবকিছুই যেন তাঁর নিজের করে নিয়ে প্রতিটি নাগরিককে সেবা দিয়ে গেছেন আপন মহিমায়।

 

বিদায়কালে জুড়ীনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে অসীম চন্দ্র বণিক বলেন, পদোন্নতি কাজ করার বড় সুযোগ। বড় বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখার দারুন একটা প্লাটফর্ম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদটি। সরকার এই পদে কাজ করার সুযোগ দানের জন্য চিরকৃতজ্ঞ। তিনি আরও বলেন, আমার দায়িত্বকালীন সময়ে জুড়ীবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি। দায়িত্ববোধ থেকে সার্বিক বিষয়ে নিজের সেরাটা নিংড়ে দিয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। চাকুরীর সুবাধে যেখানেই দায়িত্ব পালন করি না কেন জুড়ীবাসীর কথা মনে থাকবে আমার চিরকাল।

 

গত সোমবার শেষ কার্যদিবসের পর জুড়ী থেকে বিদায় নিয়েছেন এ কর্মকর্তা।  এসময় ভারাক্রান্ত মন নিয়ে তাঁকে বিদায় জানান জুড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং সাংবাদিকগণ। চিরসবুজ, চিরতরুণ এ কর্মকর্তার জীবনের সব ভালোর প্রার্থনা করেছেন সবাই।

 

লেখক: বিশেষ প্রতিবেদক, জুড়ীনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।