নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় : খলজিকে নিয়ে মিথ্যাচার

প্রকাশিত: ২:৪২ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৩, ২০২০

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় : খলজিকে নিয়ে মিথ্যাচার

রাহাত আশরাফ শাওন:  কতিপয় হিন্দু এবং সেকুলার ঐতিহাসিকেরা বঙ্গবিজয়ী মহান মুজাহিদ ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজিকে অপবাদ দেন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় তিনি ধ্বংস করেছেন বলে। অনেক সাধারন মানুষ এদের মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হয়ে তা বিশ্বাসও করে বসে আছেন।

 

ভ্রান্ত ইতিহাস প্রচারকারীদের দাবি; খলজি নদীয়া জয়ের পর তিনি স্থানীয় অধীবাসীদের উপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালান। নারী শিশুর আহাজারিও তাঁর পাষাণ হৃদয়ে দাগ কাটেনি। হিন্দুদের পরমযত্নে গড়ে তোলা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো মানমন্দির নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর হাত থেকে রক্ষা পায়নি। বিদ্যালয় ভবনগুলো তিনি গুড়িয়ে দেন। লাইব্রেরীতে আগুন ধরিয়ে দিলে বইয়ের অধিক্যে তা পুরোপুরি ভস্মীভূত হতে প্রায় ছয় মাসের মতো সময় লাগে। বর্তমানে নালন্দার গেটেও টাঙ্গিয়ে রাখা হয়েছে, সর্বশেষ ১২০৩ সালে খলজির হাতে এটি ধ্বংস হয়।

 

এখন আসুন দেখা যাক এগুলোর সত্যতা কতটুকু। বিহারে অবস্থিত নালন্দা কিন্তু হিন্দুদের কোন মানমন্দির নয়। এটি উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে বৌদ্ধদের দ্বারা। এটা পরিচালিতও হতো বৌদ্ধদের দ্বারা। ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত তৎকালীন নদিয়া ছিলো হিন্দুদের অন্যতম একটি তীর্থস্থান। এখানে বসবাস ছিল হিন্দু এলিট শ্রেণীর। লক্ষ্মণ সেন নিজের শেষ সময়টা কাটানোর জন্য এটি বেছে নেন। অধীবাসীদের বেশিরভাগই ছিলেন ব্রাহ্মণ। খলজীর নদীয়া আক্রমণের প্রায় বছর দুয়েক আগেই এরা সুযোগ বুঝে পালাতে থাকে, কারণ খলজীর প্রভাব বিস্তার সম্পর্কে এরা অবগত ছিলেন। খলজী নদীয়া আক্রমণ করেন পশ্চিম সীমান্তের ঝাড়খন্ডের দূর্গম জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। তো এই দূর্গম জঙ্গলের ভিতর খলজী গণহত্যা কার উপর চালিয়েছেন? তিনি যখন মূল শহরে প্রবেশ করেন তখন তাঁর সঙ্গে ছিল মাত্র ১৭ জন। যদিও ধরে নেই এই ১৭ জন সৈন্য নিয়েই তিনি গণহত্যা চালাচ্ছিলেন, তখন হিন্দু মহাবীরেরা কি করছিলেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যেমন তাদের কাছে নেই, তাদের দাবি করা অভিযোগগুলোর বিষয়েও তাদের কাছে কোন ঐতিহাসিক দলীল নেই।

 

নালন্দা মোট তিনবার আক্রান্ত হয়। প্রথম আক্রমণের শিকার হয় প্রতিষ্ঠার একশ’ বছরের মধ্যে হুনদের দ্বারা। দ্বিতীয় আক্রমণের শিকার হয় হিন্দুদের মহারাজা শশাঙ্কের হাতে। ঐতিহাসিক ডিডি গোস্বামী এ সম্পর্কে বলেন, সর্বপ্রথম এই মহাবিহারের উপর আক্রমণ আসে শশাঙ্ক নরেন্দ্রগুপ্তের দ্বারা। তার বৌদ্ধ বিদ্বেষ এতোটাই তীব্র ছিল যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সেনাবাহিনী নিয়ে এসে গাঙ্গেয় উপদ্বীপ দখল বৌদ্ধ অনুরুক্ত হর্ষবর্ধনকে হত্যার করার পর বোধিবৃক্ষকে উপড়ে নদীতে ফেলে দেন, বৌদ্ধের পদচিহ্ন ধ্বংস করেন। নালন্দার প্রভূত ক্ষতি সাধন করেন তিনি। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ্গের আগমনের সময়ও নালন্দা তার দৈন্যদশা থেকে বের হতে পারেনি। তৃতীয় আক্রমণ হয় এক বহিঃশত্রু দ্বারা ১১৯৩ সালে। এই সময় নালন্দা পুরোপুরি ভস্মীভূত করা হয়। এই আক্রমণের সময়কাল নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।

 

এখন আসুন, খলজীর দিকে ফিরে যাই। হিন্দু ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের ভাষায়,খলজী হিন্দুস্থানে আসেন ১১৯৫ সালে। হুসাম উদ্দীনের কাছে কাজ পান ১১৯৬ সালে। উদন্তপুরী বিহার আক্রমণ করেন ১১৯৯ সালে। ইরফান হাবিবের ভাষ্যমতে ১১৯৯ সালে দক্ষিণ বিহারে অভিযান চালিয়ে খলজী গোবিন্দপালকে পরাজিত করেন। নালন্দা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। তাবাকাতে নাসিরিতে যে টিকিওয়ালা ব্রাহ্মণদের হত্যা এবং মন্দির ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে, এটি হচ্ছে মূলত বৌদ্ধদের এই উদন্তপুরী বিহার। খলজী দূর্গ ভেবে বিভ্রান্ত হয়ে এটি আক্রমণ করেন, যা ছিল লক্ষণসেনেরই চাল।

 

যদুনাথ সরকারের মতে খলজীর বাংলা আক্রমণ ছিলো ১২০১ সালে। এখানে সবচেয়ে মজার বিষয়টি হচ্ছে সকল ঐতিহাসিকের দাবি অনুযায়ী খলজী বঙ্গবিজয় করেন ১২০৪ সালের ১০মে। অন্যদিকে অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে নালন্দাবিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করা হয় ১১৯৩ সালে। যে লোকটি বাংলায় আসেন ১২০৪ সালে, তিনি কি করে ১১৯৩ সালে নালন্দা ধ্বংস করলেন তা ইতিহাস বিকৃতিকারীরাই ভালো বলতে পারবেন।

 

মুলত ১১৯৩ সালে নালন্দা যার হাতে ধ্বংস হয়েছিল তিনি হচ্ছেন তীরহুতের হিন্দুরাজা অর্জুন। যার দায় চাপানো হয় মহান মুজাহিদ ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির উপর।

 

তথ্যসূত্র: ১। মুসলিম আমলে বাংলার শাসনকর্তা : আসকার ইবনে শাইখ। ২। দ্যা হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল : শ্রী দীনেশচন্দ্র। ৩। বাংলার ইতিহাস আদিপর্ব : নিহাররঞ্জন রায়। ৪। বাংলার ইতিহাস, সুলতানী আমল : ড. আবদুল করিম। ৫। হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল : কালিকা রঞ্জন কানুনগো।