গোগালীছড়া নদীকে জলমহালের অপবাদ

প্রকাশিত: ৭:২৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০২০

গোগালীছড়া নদীকে জলমহালের অপবাদ

বিশেষ প্রতিবেদক: ‘বদ্ধ জলমহাল’ থেকে মুক্তি পায়নি জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার কয়েকটি এলাকা দিয়ে প্রবাহিত গোগালীছড়া নদী। মাছ ধরার জন্য একে বিভিন্ন সময়ে মৎস্যজীবী সমিতিকে ইজারা দেওয়া হয়। এর ফলে বোরো ধানের মৌসুমে সেচসুবিধা এবং নদীতে মাছ ধরা নিয়ে ইজারাদারের সঙ্গে স্থানীয় লোকজনের প্রায়ই সংঘাত ঘটে।

 

অথচ, ২০১৪ সালে এ নিয়ে গণমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশাসনিক তদন্তে গোগালীছড়াকে ‘প্রবহমান নদী’ উল্লেখ করে এটিকে ইজারা না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু, পরবর্তীতে এ ব্যাপারে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

 

বিজ্ঞাপন

দুই উপজেলার ভূমি কার্যালয় ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, কুলাউড়া ও জুড়ী উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত হাড়ারগজ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে গোগালীছড়ার উৎপত্তি। নদীটি কুলাউড়া উপজেলার জয়চন্ডী ও ভুকশিমইল এবং জুড়ীর জায়ফরনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম হয়ে হাকালুকি হাওরে ফানাই নদীতে গিয়ে মিশেছে।

 

২০০৭ সালে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গোগালীছড়াকে ‘বদ্ধ জলমহাল’ হিসেবে ছয় নম্বর নথিতে (জলমহালের জন্য নির্ধারিত নথি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটির আয়তন উল্লেখ করা হয়, ২৬ দশমিক ৬০ একর। প্রতিবেদনে কুলাউড়ার ইসলামগঞ্জ বাজার এলাকায় গোগালীছড়ায় স্থায়ী বাঁধ থাকার কথা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালের ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে দরিদ্র জেলে সাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণার্থে এবং তাঁদের জীবিকা নির্বাহে সরকার নদী, খাল ও উন্মুক্ত শ্রেণির ছড়া; যা জলমহালের আওতায় রয়েছে সেগুলোর ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

 

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকের শেষ পাতায় এ বিষয়ে ‘নদীকে বদ্ধ জলমহাল দেখিয়ে ইজারা! ২০ হাজার একর জমিতে বোরো আবাদ ব্যাহত হওয়ার আশংকা’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে এ ব্যাপারে সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে জুড়ীর ইউএনওকে চিঠি দেওয়া হয়। ইউএনও উপজেলার তৎকালীন মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবীকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন। নদী তীরবর্তী এলাকার লোকজনের দেওয়া তথ্য ও সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতে মৎস্য কর্মকর্তা তাঁর প্রতিবেদনে বলেন, গোগালীছড়া প্রবহমান নদী। এটি বদ্ধ নয়। ভূমি কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট মৌজার মানচিত্রেও এটিকে প্রবহমান নদী উল্লেখ করা হয়েছে। উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামায় বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত এ নদীতে প্রবল স্রোত  থাকে। নদীটির গভীরতা ১৫-২০ ফুট, প্রস্থ ১০০-২০০ ফুট ও দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। শুষ্ক মৌসুমে বোরো আবাদে সেচের জন্য পানি আটকাতে স্থানীয় লোকজন নদীর বিভিন্ন স্থানে মাটি ফেলে অস্থায়ী বাঁধ স্থাপন করেন। এ অবস্থায় গোগালীছড়াকে ইজারা না দেওয়া এবং একে প্রবহমান নদী হিসেবে ঘোষণার জন্য প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনটি পরে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়।

 

উপজেলা প্রশাসন জানায়, সর্ব শেষ গোগালীছড়া বদ্ধ জলমহালটি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বার্ষিক (প্রথম চার বছর) ১ লাখ ৭২ হাজার ৬২০ টাকায় ১৪২৫ থেকে ১৪৩০ বাংলা সন পর্যন্ত ছয় বছর মেয়াদে কুলাউড়ার জয়চন্ডী ইউনিয়নের ‘শাপলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে’ ইজারা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী দুই বছর ইজারামুল্য ২৫ শতাংশ বেশি দিতে হবে। সম্প্রতি শাপলা মৎস্যজীবী সমিতির সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তিনি বলেন, জুড়ীর জায়ফরনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মতছিন আলীসহ স্থানীয় আরও কিছু লোক গোগালীছড়ার শাহপুর অংশে তাঁর লোকজনকে মাছ ধরতে বাধা দেন। মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম লুটপাট করা হয়েছে।

 

মতছিন আলী বলেন, হাকালুকি হাওর এলাকায় বোরো ধান চাষে সেচের জন্য গোগালীছড়ার ওপর কৃষকেরা নির্ভরশীল। কিন্তু, উন্মুক্ত এ নদীটিকে বদ্ধ জলমহাল হিসেবে ইজারা দেওয়ায় সেচসুবিধা মেলে না। ইজারাদাররা নানা অজুহাত দেখান। তখন বোরো চাষ ব্যাহত হয়। পাশাপাশি মৎস্যজীবীরা মাছ ধরতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন।

 

জুড়ীর বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান রুহুল ইসলাম বলেন, গোগালীছড়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের মাসিক সমন্বয় সভায় আলোচনা করবেন।

 

মৌলভীবাজারের বর্তমান জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান গত সোমবার (১২ অক্টোবর) রাতে মুঠোফোনে বলেন, উন্মুক্ত নদী কীভাবে বদ্ধ জলমহাল হলো-সে বিষয়ে তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।

 

জুড়ীনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/বিপি/কেপি